কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে الإيمان (ঈমান) এর পরিচয় দাও। المؤمن الكامل (আল মু’মিনুল কামিল) বা পরিপূর্ণ মুমিন হওয়ার জন্য কী কী গুণাবলি অপরিহার্য? বর্ণনা কর | Provide an introduction to Al-Iman (Faith) according to the Quran and Sunnah. Discuss the indispensable attributes necessary to attain the status of Al-Mu'min al-Kamil (the Complete Believer)
প্রশ্ন: কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে الإيمان (ঈমান) এর পরিচয় দাও। الكامل المؤمن (আল মু’মিনুল কামিল) বা পরিপূর্ণ মুমিন হওয়ার জন্য কী কী গুণাবলি অপরিহার্য? বর্ণনা কর।
১. ঈমানের আভিধানিক পরিচয় (Linguistic
Meaning of Iman)
الإيمان (আল-ঈমান) শব্দটি আরবী الأمن (আল-আমনু) ক্রিয়ামূল থেকে উৎপন্ন। মূল অক্ষর أ, م ও ن। জিনসে الفاءمهموز (মাহমুজে ফা)। আভিধানিক অর্থ-
- স্বীকৃতি
দেওয়া: التصديق (আত-তাসদীক) অর্থাৎ কোনো বিষয়ে সত্য বলে স্বীকৃতি দেওয়া।
- নিরাপত্তা
দান করা: الأمن (আল-আমনু) অর্থাৎ কাউকে ভীতি থেকে নিরাপত্তা দান করা। যেহেতু মুমিন
ব্যক্তি আল্লাহকে বিশ্বাস করে নিজের পরকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তাই একে ঈমান বলা হয়।
- আস্থা ও বিশ্বাস: الطمأنينة (আত-তুমানীনাহ) অর্থাৎ কোনো বিষয়ের ওপর অন্তরের প্রশান্তি ও অটল বিশ্বাস।
২. ঈমানের পারিভাষিক পরিচয় (Technical
Meaning of Iman)
শরীয়তের পরিভাষায়: ঈমান হলো
মহান আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল (সা.) প্রদত্ত সকল মৌলিক বিষয়কে অন্তরে বিশ্বাস
করা, মুখে স্বীকার করা এবং তদানুযায়ী আমল করা।
# আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নিকট ঈমানের সংজ্ঞা:
(আল-ঈমানু কাওলুন বিল লিসানি, ওয়া তাসদীকুন বিল কালবি, ওয়া আমালুন বিল আরকানি)।
* কুরআনের দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"প্রকৃত মুমিন তারাই, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে, অতঃপর তাতে কোনো সন্দেহ পোষণ করেনি।" (সূরা আল-হুজুরাত: ১৫)
* সুন্নাহর দলিল:
বিখ্যাত جبريل حديث (হাদিসে জিবরীল)-এ রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈমানের ছয়টি স্তম্ভের কথা উল্লেখ করেছেন:
(ঈমান হলো) তুমি বিশ্বাস করবে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি, তাঁর রাসূলগণের প্রতি, পরকালের প্রতি এবং ভাগ্যের ভালো-মন্দের প্রতি।" (সহীহ মুসলিম)
৩. প্রখ্যাত ইমাম ও আলেমগণের দৃষ্টিতে ঈমান:
ক. ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর মতে:
তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ الأكبرالفقه (আল-ফিকহুল আকবার)-এ লিখেছেন:
(আল-ঈমানু হুয়াল ইকরারু বিল লিসানি ওয়াত তাসদীকু বিল জানান)।
খ. ইমাম শাফিঈ (র.)-এর মতে:
তিনি তাঁর الأم كتاب (কিতাবুল উম্ম)-এ বর্ণনা করেছেন:
(আন্নাল ঈমানা কাওলুন ওয়া আমালুন ওয়া নিয়্যাতুন, লা ইউজজিউ ওয়াহিদুল মিনাস সালাসাতি ইল্লা বিল আখারি)।
গ. ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (র.)-এর মতে:
তিনি তাঁর الفتاوى مجموع (মাজমুউল ফাতাওয়া) গ্রন্থে বলেছেন, ঈমান কেবল মৌখিক বা মানসিক বিষয় নয়; বরং আমল বা কাজ ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেন:
(আল-ঈমানু ইয়াতাফাদালু ওয়া ইয়াযীদু ওয়া ইয়ানকুসু)।
ঘ. ইমাম আল-গাযালী (র.)-এর মতে:
তিনি তাঁর
৪. আল-মু’মিনুল কামিল (المؤمن الكامل) বা পরিপূর্ণ মুমিন হওয়ার গুণাবলি
কুরআন ও সুন্নাহর দলিল অনুযায়ী পরিপূর্ণ মুমিন হওয়ার জন্য
নিম্নোক্ত গুণাবলি অর্জন করা অপরিহার্য:
১. আল্লাহর জিকিরে অন্তর প্রকম্পিত হওয়া:
পরিপূর্ণ মুমিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আল্লাহর মহিমা শুনলে
তার অন্তরে ভীতি ও শ্রদ্ধা সৃষ্টি হয়।
দলিল:
(ইন্নামাল মু'মিনুনাল্লাযীনা ইযা যুকিরাল্লাহু ওয়াজিলাত কুলুবুহুম)।
২. ঈমান বৃদ্ধি ও তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর ভরসা):
কুরআন তিলাওয়াত শুনলে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা
একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করে।
দলিল:
‘
(ওয়া ইযা তুলিয়াত আলাইহিম আয়াতুহু যাদাতহুম ঈমানাও ওয়া আলা রাব্বিহিম ইয়াতাওয়াক্কালুন)।
৩. একাগ্রতার সাথে সালাত আদায়:
নামাজে একাগ্রতা ও বিনয় থাকা পরিপূর্ণ মুমিনের লক্ষণ।
দলিল:
(আল্লাযীনা হুম ফী সালাতিহিম খাশীউন)।
৪. অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকা:
পরিপূর্ণ মুমিন নিরর্থক কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকে।
দলিল:
(ওয়াল্লাযীনা হুম আনিল লাগউই মু'রিযুন)।
৫. আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা:
আমানত রক্ষা করা ঈমানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাসূল (সা.)
বলেছেন, যার
আমানতদারিতা নেই, তার
ঈমান নেই।
দলিল:
(ওয়াল্লাযীনা হুম লিআমানতিহিম ওয়া আহদিহিম রাউন)।
৬. প্রিয় নবী (সা.)-কে সর্বোচ্চ ভালোবাসা:
রাসূলের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া ঈমান পূর্ণতা পায় না।
দলিল (হাদিস):
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
৭. অন্যের কল্যাণ কামনা করা:
মুমিন ব্যক্তি স্বার্থপর হয় না, সে অন্যের
জন্য সেটাই পছন্দ করে যা নিজের জন্য করে।
দলিল (হাদিস):
(লা ইউ'মিনু আহাদুকুম হাত্তা ইউহিব্বা লিআখীহি মা ইউহিব্বু লিনাফসিহী)।
৮. লজ্জাশীলতা:
লজ্জা মুমিনের ভূষণ। এটি ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা।
দলিল (হাদিস):
(আল-হায়ায়ু শু’বাতু মিনাল ঈমান)
উপসংহার:
পরিপূর্ণ মুমিন হওয়ার জন্য التوحيد (আত-তাওহীদ) বা আল্লাহর একত্ববাদের ওপর অটল থাকার পাশাপাশি الصالح العمل (আল-আমালুস সালিহ) বা নেক আমলের নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। যখন কোনো মুমিনের ভেতর এই গুণগুলো প্রস্ফুটিত হয়, তখনই তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর বিশেষ পুরস্কার ও জান্নাতের অধিকারী হন।
পোস্ট কি-ওয়ার্ড (Keywords)
ঈমানের পরিচয় | Identification of Iman | আল-মু’মিনুল কামিল | Al-Mu’minul Kamil | পরিপূর্ণ মুমিনের গুণাবলি | Qualities of a Perfect Believer | আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ | Ahlus Sunnah Wal Jama'ah | ঈমান ও আমল | Iman and Amal | তাকওয়া ও তাওয়াক্কুল | Taqwa and Tawakkul | ঈমান বৃদ্ধির উপায় | Ways to Increase Faith
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (Q&A)
১. প্রশ্ন: ঈমানের মূল ভিত্তি বা স্তম্ভ কয়টি ও কী কী?
উত্তর: ঈমানের মূল ভিত্তি বা স্তম্ভ মোট ৬টি। বিখ্যাত
২. প্রশ্ন: আমল বা কাজ কি ঈমানের অংশ?
উত্তর: অধিকাংশ আলেমের মতে, বিশেষ করে
৩. প্রশ্ন: মানুষের ঈমান কি বাড়ে কিংবা কমে?
উত্তর: হ্যাঁ, কুরআন ও সুন্নাহর দলিল অনুযায়ী
মানুষের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং হ্রাস পায়। নেক আমল ও ইবাদতের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি
পায় (
৪. প্রশ্ন: একজন পরিপূর্ণ মুমিনের সামাজিক আচরণ কেমন হওয়া
উচিত?
উত্তর: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস অনুযায়ী, একজন পরিপূর্ণ মুমিন হবে অন্য মানুষের জন্য কল্যাণকামী। সে নিজের জন্য যা
পছন্দ করবে, তার ভাইয়ের জন্যও তা-ই পছন্দ করবে। এছাড়া তার
হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমানরা নিরাপদ থাকবে। একেই ইসলামে
৫. প্রশ্ন: পরিপূর্ণ মুমিন হওয়ার জন্য রাসূল (সা.)-এর প্রতি
ভালোবাসা কেন জরুরি?
উত্তর: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ঈমানের মানদণ্ড। হাদিসে এসেছে, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি তার পিতামাতা, সন্তান এবং দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে নবীজিকে বেশি ভালো না বাসবে, ততক্ষণ সে الْمُؤْمِنُ الْكَامِلُ (আল-মু’মিনুল কামিল) বা পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না। কারণ রাসূলের আদর্শ অনুসরণই হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের একমাত্র পথ।


No comments