Header Ads

Header ADS

মরীচিকার পিছে || Morichikar Piche || গল্প ও আড্ডা || Stories & Chats || পর্ব-২

 


সতর্কবার্তা:মরীচিকার পিছে’ গল্পটি কেবল একটি শিক্ষণীয় গল্প। এই গল্পের সকল চরিত্র সামাজিক বাস্তবতার দৃশ্যপট। গল্পে যে নামগুলি ব্যবহার করা হয়েছে তা কোন সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। যদি কেউ তার নামের সাথে মিল খুঁজে পান তবে তা নিতান্তই কাকতালীয়। এর জন্য “দ্যা সিটি অফ নলেজ” ব্লগ পেইজ বা পেইজের সাথে সংশ্লিষ্ট কেউ কোনভাবে দায়ী নয়।

গল্পের নাম: মরীচিকার পিছে

লেখক: মোঃ আব্দুর রহমান

দ্বিতীয় পর্ব: চোরাবালির গভীরতা

প্রথম সেমিস্টারের অভাবনীয় রেজাল্ট রিতার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। যে মেয়েটি আগে লাইব্রেরির কোণায় বসে পুরনো নোটস নাড়াচাড়া করত, তার হাতে এখন ঝকঝকে নতুন স্মার্টফোন। যেটি স্যার তাকে গিফট করেছে। তার কথা বলার ধরনেও এক ধরণের আভিজাত্য এবং অহংকার চলে এসেছে। সে এখন আর বাসে চড়ে হলে ফেরে না, প্রায়ই সন্ধ্যার পর তাকে ডিপার্টমেন্টের করিডোর দিয়ে নিলয় স্যারের ব্যক্তিগত গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়।

বন্ধুদের আড্ডায় এখন রিতাকে আর আগের মতো পাওয়া যায় না। নিলা আর মৌ একদিন ক্যাফেটেরিয়ায় বসে চা পান করছিল, এমন সময় রিতা দামী এক সানগ্লাস পরে তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। নিলা ডাক দিল, "কিরে রিতা, আমাদের তো ভুলেই গেলি! ভালো রেজাল্ট করার পর থেকে তো ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছিস।"

রিতা একটু তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, "আসলে পড়াশোনার আর প্রজেক্টের এত চাপ যে সময় করে উঠতে পারি না রে। তোরা তো জানিস, নিলয় স্যার আমাকে উনার রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিয়েছেন, অনেক কাজ করতে হয়।"

পেছন থেকে সাজিদ বাঁকা হাসিতে ফোড়ন কাটল, "রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট নাকি অন্য কিছু? শোন রিতা, তুই যে নোটস থেকে পড়িস সেটা তো আমাদেরও দেখাস না। আমরা তো হন্যে হয়ে লাইব্রেরিতে বই খুঁজি, আর তুই বিনাশ্রমে টপ করিস। রহস্যটা কী?"

রিতার বুকটা একটু কেঁপে উঠল, কিন্তু সে দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে কঠিন গলায় বলল, "হিংসা করা তোদের পুরনো অভ্যাস সাজিদ। আমি মেধা দিয়ে টপ করেছি, স্যারের গাইডেন্স নিয়েছি। এতে দোষের কিছু দেখি না।"

রিতা ওখান থেকে গটগট করে চলে গেল। কিন্তু তার মনের ভেতরে এক ধরণের দহন চলছিল। সে জানত, মেধা নয়, সে তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ বিসর্জন দিয়ে এই নম্বর কিনছে। নিলয় আহমেদ তাকে এখন আর শুধু ক্লাসরুমে ডাকেন না। ক্যাম্পাসের বাইরে শহরে তার একটি ব্যক্তিগত ফ্ল্যাট আছে, যা তিনি ‘রিসার্চ সেন্টার’ হিসেবে পরিচয় দেন। সেখানেই রিতার আসল পড়াশোনা চলে।

ড. নিলয় আহমেদ লোকটা ছিলেন ধুরন্ধর। তিনি জানতেন রিতার দুর্বলতা কোথায়। অভাবের জ্বালা সয়ে আসা রিতার সামনে তিনি যখন দামী ড্রেস, প্রসাধন আর বিলাসিতার জগৎ মেলে ধরলেন, রিতা তখন নিজের নীতি-নৈতিকতা সহসাই ভুলে যেতে থাকলো। নৈতিকতা আর সততাকে তার সফলতার পথে প্রতিবন্ধকতা মনে হলো। এক সন্ধ্যায় ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিলয় স্যার রিতার চিবুক ধরে বললেন, "রিতা, তুমি বড্ড অবুঝ। কেন এত পরিশ্রম করবে? তোমার মতো রূপবতী মেয়ের জন্য তো সারা শহর লুটিয়ে পড়া উচিত। আমি থাকতে তোমার কোনো অভাব থাকবে না, শুধু আমার সাথে থেকো।"

রিতা এখন আর হাড়ভাঙা খাটুনি করে পড়ার প্রয়োজন বোধ করে না। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে ভালো ফলাফল করার চিন্তাকে এখন তার কাছে গাধার পরিশ্রম বলে মনে হয়। কারণ, সে জানে পরীক্ষার আগের রাতে স্যার তাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের তালিকা দিয়ে দেবেন এবং পরীক্ষার পর তার উত্তরপত্রটি স্যারের হাতেই যাবে। সে এখন পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে আয়নার সামনে সময় কাটাতে বেশি পছন্দ করে। ড. নিলয় তাকে শিখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে আভিজাত্য বজায় রাখতে হয়, কীভাবে কথা বলতে হয়। রিতা যেন নিজেকে ওই বিভাগের অঘোষিত সম্রাজ্ঞী ভাবতে শুরু করল।

তার এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছিল আদনানকেআদনান ছিল অত্যন্ত শান্ত এবং রিতার প্রতি অনুরক্ত। সে একদিন সাহস করে রিতার পথ আটকাল। ক্যাম্পাসের শ্যাডো এরিয়ায় আদনান বলল, "রিতা, তুই কি জানিস ক্যাম্পাসে তোকে নিয়ে কী ধরণের কথা হচ্ছে? লোকে বলে তুই নিলয় স্যারের রক্ষিতা হয়ে গেছিস। তুই তো এমন ছিলি না রিতা! কেন নিজেকে এভাবে শেষ করছিস? কেন নিজেকে অন্ধকার জগতের দিকে ঠেলে দিচ্ছিস?"
রিতা মুহূর্তেই ক্ষিপ্ত হয়ে আদনানের গালে একটা চড় কষিয়ে দিল। "মুখ সামলে কথা বল আদনান! তুই আমার বন্ধু হতে পারিস কিন্তু আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলার অধিকার তোকে কেউ দেয়নি। আমি স্যারের প্রিয় ছাত্রী, তাই লোকে ঈর্ষা করে এসব গুজব ছড়াচ্ছে।"

আদনান মনে কষ্ট আর চোখে জল নিয়ে চলে গেল। কিন্তু সুমি আর তনিমা ব্যাপারটা এত সহজে ছেড়ে দিল না। তারা খেয়াল করল রিতা এখন আর ডিপার্টমেন্টের কমন রুমে ড্রেস চেঞ্জ করে না, সে সরাসরি স্যারের ব্যক্তিগত ওয়াশরুম ব্যবহার করে। এমনকি মাঝে মাঝে ক্লাসের মাঝখানেও স্যারের পিয়ন এসে তাকে ডেকে নিয়ে যায়।

একদিন তনিমা রিতাকে ধরল, "রিতা, তুই নিজেকে অনেক চালাক মনে করিস, কিন্তু মনে রাখিস- দেয়ালেরও কান আছে। তুই যে স্যারের সাথে অবৈধ সম্পর্কে আছিস, সেটা এখন ডিপার্টমেন্টের পিয়ন থেকে শুরু করে ঝাড়ুদার পর্যন্ত সবাই জানে। তুই নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছিস। তোর এই কর্মফল একদিন ঠিকই ভোগ করবি"

রিতা এবার আর রেগে গেল না, বরং তার গলায় ফুটে উঠল চরম ঔদ্ধত্য। "ভবিষ্যৎ? আমার ভবিষ্যৎ এখন তোদের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল। আমি এই ভার্সিটি শেষ করে বিদেশ যাব, স্কলারশিপের ব্যবস্থা স্যারই করবেন। আর তোরা সারাজীবন এই লাইব্রেরিতে ধুলো মেখে পড়ে থাকিস।"

দ্বিতীয় সেমিস্টার শুরুর পর রিতা পড়াশোনা প্রায় ছেড়েই দিল। সে এখন নিলয় স্যারের ফ্ল্যাটে দিনের পর দিন পড়ে থাকে। নিলয় আহমেদও তাকে নিয়ে উন্মত্ত হয়ে উঠলেন। রিতাকে তিনি দামী দামী উপহার দিয়ে ভলিয়ে রাখতেন। রিতার মনে তখন আর কোনো ভয় নেই। সে ভাবল, যে দারিদ্র্য তাকে সমাজ থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল, আজ সেই সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে সে দেখিয়ে দিচ্ছে সে কতটা শক্তিশালী।

কিন্তু রিতা বুঝতে পারছিল না, নিলয় আহমেদ তাকে সাহায্য করছেন না, বরং তিল তিল করে তাকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে যাচ্ছেন। রিতার অবচেতন মনে এক ধরণের অলসতা গেঁথে গেল। সে মনে করতে শুরু করল, কষ্ট করে অর্জন করার চেয়ে কারো ছত্রছায়ায় থেকে পাওয়া অনেক বেশি সহজ। রিতার এই ‘সহজ পথ’ পাওয়ার নেশা তাকে তার পুরনো বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিল।

এদিকে সাজিদ তক্কে তক্কে ছিল। সে রিতার এই অভাবনীয় উত্থান মেনে নিতে পারছিল না। সে জানত রিতার বাবা-মা কতটা গরীব। সে রিতার দামী স্মার্টফোন আর দামী লাইফস্টাইলের উৎস খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে উঠল। সাজিদ একদিন মৌ আর নিলাকে নিয়ে পরিকল্পনা করল, "আমাদের রিতার পিছু নিতে হবে। দেখতে হবে ও পড়াশোনার নামে কোথায় যায়।"

রিতা তখন তার মোহে অন্ধ। সে বুঝতে পারেনি তার অগোচরে তারই চারধারে এক অদৃশ্য গোয়েন্দা জাল বোনা হচ্ছে। সে দিনের পর দিন ক্লাস ফাঁকি দিয়ে নিলয় স্যারের সাথে সময় কাটাত। স্যার তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন, "তুমি ক্লাসে না এলেও আমি প্রক্সি দিয়ে দেব, তোমার অ্যাটেনডেন্স নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।"

রিতার মনে হলো পৃথিবীটা কত সুন্দর! কিন্তু সে জানত না, চোরাবালিতে যখন মানুষ নামে, তখন শুরুতে খুব আরাম লাগে, কিন্তু একবার হাঁটু পর্যন্ত দেবে গেলে সেখান থেকে ফিরে আসা যায়না। রিতা তখন সেই চোরাবালির কোমর পর্যন্ত দেবে গেছে, কিন্তু তার মুখে তখন বিজয়ের হাসি। সে জানত না, নিয়তি তার জন্য এক ভয়ংকর মোড় অপেক্ষা করে রেখেছে। চলবে............

আরো পড়ুন

‘মরীচিকার পিছে’ গল্পের তৃতী পর্ব: মোহের আবরণে বিষের ছোঁয়া

পরবর্তী পর্বের জন্য চোখ রাখুন আমাদের ফেসবুক পেইজ “The City of Knowledge” এ। ফলো এন্ড লাইক দিয়ে পাশে থাকুন। সেই সাথে আমাদের ব্লগপোস্টগুলির নোটিফিকেশন পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ব্লগ।

পোস্ট কি-ওয়ার্ড (Post Keyword):

প্রলোভন ও চোরাবালি অনৈতিক সম্পর্কের কুফল | Evil effects of immoral relationships | শিক্ষকের লালসার শিকার মেধাবী ছাত্রী | Talented student victim of teacher's lust | সহজ পথের মরীচিকা | The mirage of easy paths | নৈতিকতার অবক্ষয় ও ছাত্রসমাজ | Moral degradation and student society | প্রলোভনে পড়ে জীবন ধ্বংস | Life ruined by temptation | সাফল্যের মোহে অন্ধ রিতা | Rita blinded by the lure of success | বিশ্বাসের অমর্যাদা ও বিশ্বাসঘাতকতা | Betrayal of trust and treachery


No comments

Theme images by Lingbeek. Powered by Blogger.