Header Ads

Header ADS

মরীচিকার পিছে || Morichikar Piche || গল্প ও আড্ডা || Stories & Chats || পর্ব-১

 

সতর্কবার্তা: ‘মরীচিকার পিছে’ গল্পটি কেবল একটি শিক্ষণীয় গল্প। এই গল্পের সকল চরিত্র সামাজিক বাস্তবতার দৃশ্যপট। গল্পে যে নামগুলি ব্যবহার করা হয়েছে তা কোন সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয় এবং কাউকে উদ্দেশ্য করে নির্ধারণ করা হয়নি। যদি কেউ তার নামের সাথে মিল খুঁজে পান তবে তা নিতান্তই কাকতালীয়। এর জন্য “দ্যা সিটি অফ নলেজ” ব্লগ পেইজ বা পেইজের সাথে সংশ্লিষ্ট কেউ কোনভাবে দায়ী নয়।

গল্পের নাম: মরীচিকার পিছে

লেখক: মোঃ আব্দুর রহমান

প্রথম পর্ব: স্বপ্নের উদ ও চোরাবালির হাতছানি

আকাশে যখন মেঘ জমে
, তখন গ্রামের কাঁচা রাস্তার ধারের জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরটিতে বৃষ্টির জল চুইয়ে পড়ত। সেই ঘরেই রিতার জন্ম। বাবা রতন মিয়া দিনমজুরের কাজ করে যা পেতেন, তা দিয়ে আধপেটা খেয়ে কোনোমতে দিন কাটত। মা রত্না বিবি অন্যের বাড়িতে ধান ভানার কাজ করতেন। অভাব-অনটনের সংসার হওয়া স্বত্ত্বেও রিতার ভেতরে ছিল এক অদম্য জেদ। দারিদ্র্য তার শরীরকে দুর্বল করলেও তার স্বপ্নকে দুর্বল করতে পারেনি। রিতার কাছে নতুন বই কেনার টাকা কোনোদিন থাকতো না। গ্রামের স্কুলে পড়ার সম সে তার বান্ধবীদের ফেলে দেওয়া পুরনো খাতা আর ধার করা বই দিয়ে পড়াশোনা করত। তার মেধা ছিল প্রখর, আর জেদ ছিল হিমালয়ের মতো অটল।

এসএসসি পরীক্ষার আগে রিতা রাত জেগে পড়ত। ঘরে কেরোসিন তেল ফুরিয়ে গেলে সে জানলার ধারে চাঁদের আলোয় পড়ার চেষ্টা করত। তার সেই অমানুষিক পরিশ্রমের ফল মিলল হাতেনাতে। সে তার পুরো এলাকায় তাক লাগিয়ে জিপিএ-৫ পেল। এইচএসসিতেও সেই ধারা অব্যাহত থাকল। এরপর শুরু হলো এক নতুন যুদ্ধপাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া। মেধা, অদম্য সাহস, জেদ আর নিরলস অধ্যাবসায়ের ফলে অবশেষে রিতা যখন দেশের এক স্বনামধন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রাষ্ট্রবিজ্ঞান’ বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেল, তখন তার বাবা রতন মিয়া হাউমাউ করে কেঁদেছিলেন। তার মনে হয়েছিল, এবার একদিন না একদিন অভাবের দিন ফুরোবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে রিতা এক নতুন জগতের সন্ধান পেল। সবুজ ঘাসে ঢাকা ক্যাম্পাস, বিশাল বিশাল লাইব্রেরি আর আধুনিক ছেলেমেয়েদের ভিড়। রিতা দেখতে ছিল বেশ সুন্দরী - উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, বড় বড় চোখ আর এক মাথা ঘন কালো চুল। তার চটপটে স্বভাবের কারণে খুব দ্রুতই তার একটি বন্ধু সার্কেল তৈরি হলো। এই দলে ছিল আটজন বন্ধু-বান্ধবী: সুমি, নিলা, তরুণ, সাজিদ, রূপসা, তনিমা, আদনান ও মৌ

প্রথম প্রথম রিতা পড়াশোনায় ছিল অত্যন্ত মনোযোগী। লাইব্রেরিতে সুমি আর তরুণের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নোটস তৈরি করত। কিন্তু অভাব তার পিছু ছাড়েনি। বন্ধু-বান্ধব ও বড় ভাইয়া-আপুদের সহায়তায় টিউশনি ম্যানেজ করে ফেললো। সেই টিউশনির সামান্য টাকা দিয়ে নিজের হাতখরচ চালিয়ে বাড়িতে টাকা পাঠাতে রিতার নাভিশ্বাস উঠত। মাঝেমধ্যে দুপুরে না খেয়ে তাকে লাইব্রেরিতে বসে থাকতে হতো। রিতার এই সৌন্দর্য, দারিদ্র্য আর প্রখর বুদ্ধিমত্তা নজর কাড়ল বিভাগের প্রভাবশালী ও সুবক্তা শিক্ষক ড. নিলয় আহমেদের (ছদ্মনাম)তিনি ছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব একজন প্রৌঢ়, যার ব্যক্তিত্বের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ধুরন্ধর শিকারি মন।

ড. নিলয় একদিন ক্লাসের পর রিতাকে তার ব্যক্তিগত চেম্বারে ডেকে পাঠালেন। রিতা ভয়ে ভয়ে ঢুকল। স্যার খুব মায়াবী গলায় বললেন, "রিতা, তোমার রেজাল্ট আর মেধা অসামান্য। কিন্তু আমি জানি তোমার পারিবারিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। এই শহরে নিজের মেধা টিকিয়ে রাখা খুব কঠিন। তুমি যদি চাও, আমি তোমাকে পড়াশোনার বিশেষ নোটস এবং আর্থিক বিষয়ে কিছু সহায়তা করতে পারি।"

রিতা তখন ছিল এক সরল বালিকা। সে ভাবল, একজন শিক্ষক যখন নিজে থেকে সাহায্য করতে চাইছেন, তখন তো ভয়ের কিছু নেই। ড. নিলয় তাকে লাইব্রেরির দুর্লভ বইগুলো ধার দিতে শুরু করলেন। প্রথম দিকে সব ঠিকই ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সাহায্যের ধরণ বদলাতে শুরু করল। নিলয় স্যার তাকে পড়াশোনার কথা বলে প্রায়ই আলাদাভাবে সময় দিতে শুরু করলেন।

বন্ধুদের মধ্যে সুমি আর তনিমা একটু দূরদর্শী প্রকৃতির ছিল। সুমি একদিন লাইব্রেরি থেকে ফেরার পথে বলল, "রিতা, নিলয় স্যার তোকে অনেক বেশি হেল্প করছেন। সবসময় স্যারের রুমে যাওয়া কি ঠিক? লোকে তো অনেক কিছু বলে।"

রিতা তখন সাহায্যের মোহে আচ্ছন্ন। সে হেসে উড়িয়ে দিল, "আরে না সুমি, স্যার তো আমার বাবার মতো। উনি আমার অবস্থা বোঝেন বলেই সাহায্য করেন। তাছাড়া উনার রিসার্চ প্রজেক্টে আমাকে অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে নেবেন বলেছেন। এতে তো ক্যারিয়ারের লাভ।"

কিন্তু রিতা বুঝতে পারছিল না, ড. নিলয় ধীরে ধীরে তাকে একটি অদৃশ্য জালে বন্দী করছেন। সাহায্য পাওয়ার পথটি ছিল অত্যন্ত পিচ্ছিল। স্যার মাঝেমধ্যে তাকে দামী বইয়ের আড়ালে প্রসাধনী বা দামী চকোলেট উপহার দিতে শুরু করলেন। অভাবের তাড়নায় বড় হওয়া রিতার কাছে এই ছোট ছোট বিলাসিতাগুলো ছিল এক বিশাল প্রাপ্তি। সে ভাবতে শুরু করল, দিনরাত লাইব্রেরিতে বসে হাড়ভাঙা খাটুনি করে পড়ার চেয়ে স্যারের দেওয়া ‘সহজ গাইডেন্স’ অনেক বেশি আরামদায়ক।

ড. নিলয় রিতার চটপটে স্বভাবের প্রশংসা করতে করতে একদিন তার মাথার চুলে হাত রাখলেন। রিতা একটু অস্বস্তিতে পড়লেও নিজেকে বোঝাল "এটা তো স্নেহের স্পর্শ।" কিন্তু ক্রমান্বয়ে সেই স্পর্শের গভীরতা বাড়ছিল। স্যার তাকে বলতেন, "রিতা, তুমি বড্ড সুন্দরী। তোমার এই চটপটে ভাবটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে। পড়াশোনা নিয়ে তুমি কেন এত টেনশন করবে? তোমার সব দায়িত্ব এখন থেকে আমার।"

এই অদ্ভুত প্রশ্রয় রিতাকে তার পরিশ্রমের জগত থেকে একটু একটু করে আলগা করে দিচ্ছিল। রিতার মনে তখন দ্বিধাএকদিকে তিলে তিলে গড়া সততার পড়াশোনা, আর অন্যদিকে ড. মাহফুজুরের হাত ধরে আসা এক জাদুকরী সহজ জীবন। রিতা তখনো জানত না, সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করতে যাচ্ছে। সে জানত না, যে হাত আজ সাহায্যের নামে তার দিকে এগিয়ে এসেছে, সেই হাতটিই তাকে এক অতল চোরাবালির দিকে টেনে নিয়ে যাবে। রিতার এই ‘সহজ পথ’ পাওয়ার নেশাই তাকে ভয়ংকর অন্ধকার জগতের দিকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। চলবে................

আরো পড়ুন

‘মরীচিকার পিছে’ গল্পের দ্বিতীয় পর্ব: চোরাবালির গভীরতা

পরবর্তী পর্বের জন্য চোখ রাখুন আমাদের ফেসবুক পেইজ “The City of Knowledge” এ। ফলো এন্ড লাইক দিয়ে পাশে থাকুন। সেই সাথে আমাদের ব্লগপোস্টগুলির নোটিফিকেশন পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ব্লগ।

পোস্ট কি-ওয়ার্ড (Post Keyword):

দারিদ্র্য ও সংগ্রামের সূচনা | মেধাবী ছাত্রীর জীবন যুদ্ধ | Life struggle of a talented student | দারিদ্র্য জয়ের অনুপ্রেরণামূলক গল্প | Inspirational story of overcoming poverty | পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন | Dream of public university admission | রিতার সংগ্রামী জীবন | Rita's struggling life | মেধার জোরে দারিদ্র্য বিমোচন | Eradicating poverty through merit | হৃদয়বিদারক বাংলা ছোটগল্প | Heart-touching Bengali short story | উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ও বাস্তবতা | Dreams and realities of higher education


No comments

Theme images by Lingbeek. Powered by Blogger.